শেখ মোস্তাফিজুল হক (নাদির) :
মাদারীপুর জেলাধীন রাজৈর উপজেলার রাজৈর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি খোন্দকার আব্দুল মতিন ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম এবং সরকারি অনুদানের টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যবৃন্দ। টানা ১৬ থেকে ১৭ বছর ওই দুই ব্যক্তি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে তারা ক্লাবের সম্পদ নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার ও সরিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের অভিযোগ অনুযায়ী জানা যায়, অভিযুক্ত ওই দুই ব্যক্তি ক্লাব থেকে যেসব মালামাল আত্মসাৎ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে ৮টি চেয়ার (যার মধ্যে পরবর্তীতে চাপে পড়ে ৬টি ফেরত দেওয়া হয়েছে) এবং ২টি ডেক্স টেবিল, ২টি কম্পিউটার, ১টি টেলিভিশন, ১টি বৈদ্যুতিক ফ্যান, ১টি ইন্টারনেট রাউটার, একটি ফ্যাক্স মেশিন এবং ১টি ফাইল ক্যাবিনেট ইত্যাদি। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ক্লাবের নামে ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা এবং সরকারি অনুদানের ২ (দুই) টন (টিআর) এর অর্থ এবং ২ (দুই) বান টিন আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

ক্লাবের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খোন্দকার আব্দুল মতিন ও জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘ ১৬/১৭ বছর ধরে রাজৈর প্রেসক্লাবকে নিজের পারিবারিক সম্পত্তির মতো নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং নিজেদের ইচ্ছে মতো ক্লাব পরিচালনা করেছেন। প্রেসক্লাবের নামে আসা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দাওয়াতপত্র বা চিঠিপত্র তারা গোপনে নিজেরাই গ্রহণ করতেন এবং অন্য কোনো সাংবাদিক বা সদস্যকে সে বিষয়ে ঘুণাক্ষরেও জানতে দিতেন না। ক্লাবের অন্যান্য সদস্যদের এড়িয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সভায় তারা একাই প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং তারা নিজেরাই প্রভাব খাঁটিয়ে বিভিন্ন অফিসে তদবির ও দালালি বাণিজ্য পরিচালনা করতেন।
এছাড়া রাজৈর উপজেলার দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটি এবং আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্যপদ পেতে সাবেক সভাপতি খোন্দকার আব্দুল মতিন জাল-জালিয়াতি ও মিথ্যা তথ্যের আশ্রয় নিয়ে তার জাতীয় পরিচয়পত্র করেছেন। এ পরিচয়পত্রের জন্য মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি হিসাবে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় নিয়োগ পেয়েছেন, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানেন না। সাবেক মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি শাজাহান খান মৃত্যু বরণ করার পর খোন্দকার আব্দুল মতিন এ নিয়োগ পেয়েছেন, যা সম্পূর্ন জাল-জালিয়াতি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি মূলত রাজৈর উপজেলার কোনো স্থায়ী বাসিন্দা বা ভোটার নন। স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি রাজৈর পৌরসভার ভোটার তালিকায় নাম স্থানান্তর করেন এবং আশ্রয়ন প্রকল্প তথা গুচ্ছগ্রামের (হৃদয়নন্দি) বাসিন্দা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন। অথচ গুচ্ছগ্রামে তার কোন জায়গা-জমি ও ঘর-বাড়ি নাই।
বাস্তবতায় তার স্ত্রী ও সন্তানরা পার্শ্ববর্তী মুকসুদপুর উপজেলার রাঘদি ইউনিয়নের চরপ্রসন্নদি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার। উক্ত ইউনিয়নের চরপ্রসন্নদি গ্রামে খোন্দকার আব্দুল মতিনের স্থায়ী বাড়ি-ঘর রয়েছে। অথচ রাজৈর পৌরসভার যে ওয়ার্ডের ভোটার হিসেবে তাকে দেখানো হয়েছে, সেখানে তার কোনো স্থায়ী বাড়ি-ঘর কিংবা নিজস্ব কোনো জমিজমা নাই। শুধুমাত্র সরকারি বিভিন্ন কমিটির সদস্যপদ বাগিয়ে নেওয়ার হীন উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর রাজৈর প্রেসক্লাবকে ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও সুবিধা হাসিলের হাতিয়ার বানানোর গুরুতর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ক্লাবের সদস্যরা। পদটিকে পুঁজি করে সরকারি টিন আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, দালালি এবং প্রেসক্লাবকে একক নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে তিনি সেখানে একচ্ছত্র ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছিলেন।
জানা যায়, রাজৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে প্রেসক্লাবের চাবি নিজের দখলে রাখতেন। সাধারণ কোনো সদস্যকে ক্লাবে ঢুকতে দেওয়া হতো না।
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর একটি হলো, রাজৈর প্রেসক্লাবের নামে বরাদ্দকৃত ২২ ফুট দৈর্ঘ্যরে দুই বান টিন তিনি ক্লাবের কাজে ব্যবহার না করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিজের ঘরের বারান্দায় লাগিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও রাজৈর প্রেসক্লাবের নাম ভাঙিয়ে উপজেলা জুড়ে নানা ধরণের চাঁদাবাজির সঙ্গেও তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া জাহাঙ্গীর আলমের এই দীর্ঘদিনের টাউটারি, বাটপারি ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে তার পারিবারিক জীবনেও দেখা দিয়েছে চরম ধস। এসব অপকর্ম ও অনৈতিক আচরণের অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত তার স্ত্রী নাসরিন আক্তার তাকে তালাক দিয়ে আলাদা হয়ে যান।
এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহল অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে সাবেক সভাপতি খোন্দকার আব্দুল মতিন ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাজৈর প্রেসক্লাবের আত্মসাৎকৃত মালামাল ও তহবিল উদ্ধারের জোর দাবি জানিয়েছেন।