এ্যাডভোকেট হাসনা পারভীন :
আইন পেশা শুধু জীবিকা অর্জনের একটি মাধ্যম নয়, এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেশা। একজন আইনজীবী আদালতে তার মক্কেলের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন, আইনি অধিকার সম্পর্কে পরামর্শ দেন এবং অনেক ক্ষেত্রে একজন নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয় হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। ফলে একজন সফল আইনজীবী হওয়ার জন্য শুধু আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গভীর জ্ঞান, যুক্তিবোধ, সততা, পেশাগত দক্ষতা, ধৈর্য, গবেষণার অভ্যাস এবং আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশে আইন পেশায় আসতে হলে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পেশাগত ও বার কাউন্সিলের নিয়ম-কানুন অনুসরণ করতে হয়। তবে আনুষ্ঠানিক যোগ্যতার বাইরে একজন আইনজীবীকে দক্ষ করে তোলে তার নিয়মিত অধ্যয়ন, বাস্তব অভিজ্ঞতা, মামলা বিশ্লেষণের ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতা।
দক্ষ আইনজীবী হওয়ার প্রথম শর্ত হলো আইনের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা। সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন, চুক্তি আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, কোম্পানি আইন ও পারিবারিক ও মুসলিম আইনসহ বিভিন্ন আইনের মৌলিক বিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। শুধু আইন বই পড়লেই হবে না, কোন আইনের কোন ধারা কোন পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য। সংশ্লিষ্ট ধারার ব্যাখ্যা কি এবং আদালত বিভিন্ন মামলায় ওই বিধান কিভাবে প্রয়োগ করেছে। এসব বিষয়ও জানতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনের সংশোধনী ও নতুন আইন সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ রাখা জরুরি।
আইন পরিবর্তনশীল একটি বিষয়। সংসদে নতুন আইন প্রণীত হতে পারে, পুরোনো আইনে সংশোধন আসতে পারে কিংবা উচ্চ আদালতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ রায়ের মাধ্যমে কোনো আইনের ব্যাখ্যা পরিবর্তিত বা সুস্পষ্ট হতে পারে। তাই আইনজীবীর জ্ঞানকে নিয়মিত চর্চায় রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে একজন আইনজীবীর জন্য দেশের সংবিধান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মৌলিক অধিকার, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, বিচার পাওয়ার অধিকারসহ সাংবিধানিক বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা একজন আইনজীবীর পেশাগত সক্ষমতা বাড়ায়। বিশেষ করে উচ্চ আদালতে সাংবিধানিক ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলায় কাজ করতে হলে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ, সাংবিধানিক নীতি এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তড় জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
এছাড়া একজন দক্ষ আইনজীবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো মামলার নথি দ্রুত ও সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারা। একটি মামলায় অনেকগুলো কাগজপত্র, স্বাক্ষ্য, দলিল, জবানবন্দি, প্রতিবেদন ও আদেশ থাকতে পারে। এসব নথির মধ্য থেকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও আইনি প্রশ্ন চিহ্নিত করতে হয়। মামলার নথি পড়ার সময় ঘটনার ধারাবাহিকতা তৈরি করা, সঠিক তারিখ চিহ্নিত করা এবং কোন তথ্য কোন দলিল বা স্বাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হতে পারে তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আইনজীবী সাধারণত মামলার দুর্বল ও শক্তিশালী উভয় দিকই খুঁজে বের করেন। শুধু নিজের মক্কেলের পক্ষে থাকা তথ্য খোঁজা যথেষ্ট নয়, বিপক্ষ কি যুক্তি দিতে পারে, তার সম্ভাব্য উত্তর কি হতে পারে এবং আদালত কোন প্রশ্ন করতে পারেন। এসব বিষয়ও আগে থেকেই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বর্তমান সময়ে একজন আইনজীবীর জন্য আইনি গবেষণা বা লিগ্যাল রিসার্চের দক্ষতা অপরিহার্য। শুধু আইন বইয়ের উপর নির্ভর না হয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নজির, আদালতের রায়, আইন কমিশনের প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক আইনি উৎস এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উপাদান পর্যালোচনা করতে হয়। কোনো মামলায় একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রশ্ন দেখা দিলে সেই বিষয়ে পূর্বে উচ্চ আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না তা খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী নজির অনেক সময় মামলার যুক্তিকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
আইনজীবীর পেশার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যুক্তি উপস্থাপন। আদালতে আবেগের চেয়ে তথ্য, আইন ও যুক্তির ভিত্তিতে বক্তব্য উপস্থাপন করতে হয়। একজন দক্ষ আইনজীবী তার বক্তব্যকে সু-সংগঠিত রাখেন। প্রথমে মামলার প্রাসঙ্গিক ঘটনা তুলে ধরেন, এরপর আইনি প্রশ্ন নির্ধারণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নজিরের আলোকে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। অতিরিক্ত কথা বলা বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে ধরা আদালতের সময় নষ্ট করতে পারে। তাই সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট ও প্রাসঙ্গিক বক্তব্য উপস্থাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আইনজীবী মানেই শুধু ভালো বক্তা এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। একজন দক্ষ আইনজীবীকে একই সঙ্গে ভালো শ্রোতাও হতে হয়। মক্কেলের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, স্বাক্ষীর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করা, বিচারকের প্রশ্ন সঠিকভাবে বোঝা এবং বিপক্ষ আইনজীবীর যুক্তির দুর্বল জায়গা শনাক্ত করার জন্য শ্রবণ দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় মক্কেল নিজের সমস্যার কথা ধারাবাহিকভাবে বলতে পারেন না। আইনজীবীকে ধৈর্যসহকারে শুনে প্রকৃত আইনি সমস্যাটি চিহ্নিত করতে হয়।
আইনের বই পড়ে আদালতের বাস্তব কার্যক্রম পুরোপুরি শেখা যায় না। একজন নতুন আইনজীবীর জন্য অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে আদালতে সময় কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ধরনের মামলা কিভাবে পরিচালিত হয়, কিভাবে আবেদন করা হয়, কিভাবে স্বাক্ষীকে জেরা করা হয়, কিভাবে আপত্তি উত্থাপন করা হয় এবং বিচারকের প্রশ্নের উত্তর কিভাবে দেওয়া হয়। এসব বিষয় বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখা যায়। বিশেষ করে সিনিয়র আইনজীবীদের আদালত পরিচালনার ধরন পর্যবেক্ষণ করে নতুন আইনজীবীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখতে পারেন।
ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় ধরনের মামলায় স্বাক্ষ্য ও জেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একজন আইনজীবীর জন্য কার্যকর জেরা পরিচালনার দক্ষতা অর্জন করা অতিব জরুরি। জেরার সময় প্রশ্নের উদ্দেশ্য পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। স্বাক্ষীকে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে মামলার ক্ষতি করা উচিত নয়। স্বাক্ষীর পূর্ববর্তী বক্তব্য, নথি এবং মামলার অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে অসঙ্গতি থাকলে তা তুলে ধরতে হয়। তবে জেরা শুধু মুখস্থ প্রশ্নের বিষয় নয়। স্বাক্ষীর উত্তর শুনে পরবর্তী প্রশ্ন তৈরি করার সক্ষমতাও একজন দক্ষ আইনজীবীর জানা প্রয়োজন। আদালতের অনেক কার্যক্রম লিখিত আবেদনের উপর নির্ভরশীল। ফলে একজন আইনজীবীর জন্য পরিষ্কার, সংক্ষিপ্ত ও আইনসম্মত ভাষায় আবেদন, লিখিত বক্তব্য, প্লিডিংস, আপিল, রিভিশন বা অন্যান্য আইনি নথি প্রস্তুত করার দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। একটি ভালো আইনি নথিতে সাধারণত ঘটনার প্রয়োজনীয় বিবরণ, আইনি ভিত্তি এবং প্রার্থনা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। অপ্রয়োজনীয় তথ্য, অস্পষ্ট ভাষা বা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য একটি আইনি নথির কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
আইন পেশায় জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি সততাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন আইনজীবীকে অবশ্যই মক্কেল, আদালত এবং সহকর্মীদের সাথে পেশাগত আচরণ বজায় রাখতে হয়। মক্কেলকে বাস্তব আইনি অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া জরুরি। কোনো মামলায় জয়ের নিশ্চয়তা দেওয়া কিংবা আদালতের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান পেশাগতভাবে অনুচিত। একজন আইনজীবীর দায়িত্ব শুধু মক্কেলের স্বার্থ রক্ষা করা নয়, আদালতের প্রতি তার পেশাগত দায়িত্বও রয়েছে। আদালতের সামনে তথ্য ও আইন যথাসম্ভব সঠিকভাবে উপস্থাপন করা এবং পেশাগত আচরণবিধি মেনে চলা আইনজীবীর দায়িত্ব। তাছাড়া একজন আইনজীবী যতই দক্ষ হোন, মক্কেলের সাথে কার্যকর যোগাযোগ না থাকলে তার পেশাগত কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মক্কেলের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করা এবং মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত করা জরুরি। মক্কেলকে জটিল আইনি বিষয় সহজ ভাষায় বোঝাতে পারাও একজন দক্ষ আইনজীবীর অন্যতম গুণ। কারণ অনেক মক্কেল আইনের ভাষা ও আদালতের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অপরিচিত থাকেন।
বাংলাদেশের আইনজীবীদের জন্য বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় ভালো দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। আদালতের বিভিন্ন নথি, আইন, রায় ও আইনি সাহিত্য অনেক সময় ইংরেজিতে পাওয়া যায়। একই সাথে মক্কেল ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য পরিষ্কার ও সহজ বাংলা ভাষায় কথা বলার দক্ষতাও অত্যন্ত জরুরি। ভাষার উপর ভালো দখল একজন আইনজীবীকে তার বক্তব্য ও লিখিত নথি আরও কার্যকরভাবে উপস্থাপনে সাহায্য করে থাকে।
আইন পেশায় অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে মামলা পরিচালনা করতে হয়। একটি মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত নাও হতে পারে। শুনানি পিছিয়ে যেতে পারে, নতুন নথি আসতে পারে কিংবা মামলার কৌশল পরিবর্তন করতে হতে পারে। তাই আইনজীবীর ধৈর্যশীল হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার মানসিক প্রস্তুতিও থাকতে হয়।
পরিশেষে বলা যায়, একজন আইনজীবীর শেখার কোনো শেষ নাই। প্রতিদিন নতুন মামলা, নতুন রায়, নতুন আইন এবং নতুন আইনি প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। তাই নিয়মিত পড়াশোনা করা পেশাগত জীবনের অপরিহার্য অংশ। আইনজীবীদের নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞানও অর্জন করতে পারেন। যেমন ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, কর আইন, কোম্পানি আইন, পারিবারিক ও মুসলিম আইন, হিন্দু আইন, শ্রম আইন, মানবাধিকার আইন কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি আইন ইত্যাদি।
আইন পেশার মূল উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। একজন আইনজীবীর পেশাগত সাফল্য শুধু কতটি মামলায় জয় পেয়েছেন তা দিয়ে নয়। যারা ভবিষ্যতে আইনজীবী হতে চান। তাদের উদ্দেশ্যে আমি এ্যাডভোকেট হাসনা পারভীন বলতে চাই, শিক্ষানবিশ হিসাবে প্রথম থেকেই নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এছাড়া বিতর্ক, বক্তৃতা, লেখালেখি ও গবেষণার মতো কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করুন। তাহলে যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়তে পারে। এছাড়া একজন দক্ষ আইনজীবী হয়ে উঠা কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া নয়। আইন বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, আদালতের বাস্তব অভিজ্ঞতা, নিয়মিত আইনি গবেষণা, যুক্তি ও বক্তব্য উপস্থাপনের দক্ষতা, সততা, নৈতিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায়ের সমন্বয়েই একজন আইনজীবী নিজেকে দক্ষ করে তুলতে পারেন।
আইনজীবীর জ্ঞান যেমন তাকে আদালতে শক্তিশালী করে, তেমনি সততা ও ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে দীর্ঘমেয়াদে একজন দায়িত্বশীল আইন পেশাজীবী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।