দীপ দাসঃ
সাহিত্যকে এক সুবিশাল সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যেখানে নদীর ন্যায় কয়েকটি শাখা-প্রশাখায় ডালপালা ছড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে। কবিতা, ছোট ও বড় গল্প, উপন্যাস, নাটক বা নাটিকা এবং গীতিকবিতা। গীতি কবিতা মূলত কবিতার একটি প্রশাখা। ইংরেজি সাহিত্যে গীতিকবিতাকে বলা হয় লিরিক। বঙ্কিমচন্দ্র তার ‘গীতিকাব্য’ প্রবন্ধে বলেছেন ‘অতএব গীতের যে উদ্দেশ্য, যে কাব্যের সেই উদ্দেশ্য, তাহাই গীতিকাব্য। গীতি কবিগণও কবি তবে তাদের লেখনীর ধরন একটু ভিন্ন হয় এবং তাদের কার্যক্রম হয় বিস্তৃত। গীত শব্দটি আমরা প্রবাদেও ব্যবহার করি। যেমনÑ ধান ভানতে শীবের গীত। এই গীত মানে গান অর্থাৎ অন্ত্যমিল রেখে সুরারোপ করা। যদি চর্যাপদ থেকে শুরু করি তাহলে গীতি কবিতার বিকাশমান ধারা অত্যন্ত প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। কারণ বাংলা সাহিত্যে গদ্য রীতির আর্বিভাব ঘটেছে বহু পরে। গীতি কবিতার ধারা প্রধানত কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগের প্রকাশ, যা সংগীতধর্মী ও ছন্দবদ্ধ। এই ধারাটি মূলত বিহারীলাল চক্রবর্তী (গীতিকাব্যের ভোরের পাখি বলা হয়) থেকে শুরু হয় এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আরও অনেক কবির হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে। চর্যাপদ হলো বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম গীতিকবিতা, যা মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের রচিত গান ও দোহার সংকলন। চর্যাপদে ৫৩ জন বা মতান্তরে ৫৪ জন কবির গীতি কবিতা সংকলিত হয়েছে। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের গ্রান্থাগার থেকে চর্যাগীতির পুঁথি আবিষ্কার করেন। পুঁথিটি খ-িত (২৩ সংখ্যক পদটির কিছু অংশ এবং ২৪, ২৫, এবং ৪৮ সংখ্যক পদ পাওয়া যায়নি) হওয়ায় সাড়ে ছেচল্লিশটি পদের পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়। বহু বছর ছন্দমিল ছাড়া কবিতা ঠিক বিবেচ্য ছিল না সাহিত্য মহলে। এই গীতিকবিতাগুলোতে তত্ত্বকথা ও সমকালীন লোকজীবনের প্রতিফলন পাওয়া যায় এবং এগুলোর প্রতিটি পদে সুর ছিল, যা সাধকরা গাইতেন।
বৈষ্ণব পদাবলিতে কোনো একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে কবিতা ও কাহিনি এগিয়েছে এবং শাক্ত পদাবলিও কাহিনি নির্ভর। কবিতায় গদ্য রীতি এসেছে তারও বহু পরে। কেউ কেউ জীবনানন্দ দাশকেই এর পুরোধা বলেন। তবে গীতি কবিতাই বাংলা কবিতা সাহিত্যের প্রাণ এমনকি বাংলা সাহিত্যেরও প্রাণ। আমাদের সহিত্যের অতীত ইতিহাস বলতেই গীতি কবিতাকে বোঝায়। বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক সমৃদ্ধ ধারাই হলো গীতি কবিতা। আর গীতি কবিগণ সেই ধারার রক্ষক। অতীতে মূলত কবিগণ গানের উদ্দেশ্যেই অধিকাংশ কবিতার লাইন লিখেছেন। ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং প্রেম কাব্য সবটাই হয়েছে গীতি কবিতার ধারায়। হিন্দু ধর্মের দেবী বন্দনা হয়েছে গীতি কবিতার ধারায়। আমাদের দেশের যে পালাগানগুলো রচিত হয়েছে গীতি কবিতার ধারায় সেসবও বেশ সমৃদ্ধ। গীতি কবিতা মূলত একজন কবির সহজ-সরল অনুভূতি যার প্রকাশও হয় অত্যন্ত সহজ ভঙ্গিতেই, একটি ভাব অথবা একটি অনুভূতির বিকাশ।
যা হতে পারে সংগীতে এবং এটি অন্যকেও অনুপ্রাণিত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতিকবিতা সম্পর্কে বলেছিলেন যে- ‘একটু খানির মধ্যে একটি মাত্র ভাবের বিকাশ। এটি গান যা সুরের মাধ্যমে আবিষ্ট হয়ে শ্রোতার কানে পৌঁছে থাকে। তবে প্রথম অবস্থায় এটি কবিতা এবং একজন কবির হাত দিয়েই তা পূর্ণ রূপ লাভ করে। তবে অন্যান্য কবির সঙ্গে গীতি কবির একটু পার্থক্য থাকে। গীতি কবির ভেতরে যে সংগীত মূর্ছনা থাকে সেটা কবির ক্ষেত্রে নাও থাকতে পারে। কারণ গীতি কবিতা লেখার উদ্দেশ্যই থাকে তাতে সুরারোপ করা। যদি সে নিজে নাও সুর করতে পারে তবু অন্য কেউ কাজটি করেন এবং তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পরে মানুষের মুখে মুখে। মোট কথা গীতি কবিতা দ্রুত ছড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য গীতিকবি।
এদের খুব কম সংখ্যকই পরিচিতি লাভ করেছেন দেশব্যাপী। নিজ জেলা বা অঞ্চলে পরিচিত এমন অসংখ্য গীতি কবিও রয়েছেন। তারা আমাদের সম্পদ। তাদের সৃষ্টিকর্ম তুলে আনা বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব। গীতি কবিতায় প্রাধান্য পায় প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি, যুদ্ধ ইত্যাদি। মোট কথা কবিতায় যে সকল উপাদান থাকে গীতি কবিতায়ও সেসবই প্রাধান্য পায় শুধু গীতি কবির অনুভূতি প্রকাশের ভিন্নতা সেসব লিরিক বা গীতিকবিতা হয়ে ওঠে।
এবার আসা যাক পাবন জেলার গীতিকবিতা ও কবির আলোচনায়। সেই অতীতকাল থেকেই পাবনা জেলা শিল্প সাহিত্যে সমৃদ্ধ। এখন পর্যন্ত এখানে জন্ম নিয়েছে বহু গীতি কবি এবং কবিতা। যদি অত্যন্ত পরিচিত এবং খ্যাতনামা গীতি কবির কথা উল্লেখ করি তাহলে প্রথমেই আসে প্রখ্যাত গীতিকার ফজল-এ-খোদার নাম। তার সালাম সালাম হাজার সালাম গানটি আমাদের আত্মার, প্রাণের- স্বাধীনতার। তবে এ তো গেল হালের কথা। পাবনা অঞ্চলের গীতি কবিতার ধারা তো আর এখনকার না। সেই আদি মধ্যযুগের কবি কৃষ্ণকিশোর রায় থেকে শুরু করে আজকের কাশিনাথপুরে বসবাস করা আলাউল হোসেন পর্যন্ত যারা সাহিত্য চর্চা করছেন, সকলেই বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করতে কাজ করছেন। কৃষ্ণকিশোর রায় লিখেছেন, প্রত্যয় বালিকাগণ উঠিয়া বিহান/গিরিপুরে মিলে আসি পার্ব্বতীর সনে/গিরিরাণী গৌরী কোলে বৈসয়ে অঙ্গনে/চারিপাশে ঘিরে আসি সব বালাগণে।
অর্থাৎ এসব গীতি কবিতা লেখা হয়েছে কাহিনিনির্ভর। আবার ক্ষেপুউল্লাহ বয়াতি তার গানে লিখেছেনÑ ও মহাত্মা বলে দেও ভাই তোমার তুল্য বন্ধু কেহ নাই/ এ বিদেশে পরবাসে ছিলাম এ কোথায়/তাই চায় দ্যাখো শমল আইলো আমাকে বাইন্ধা নিল। কল্লোল পত্রিকার অন্যতম লেখক ছিলেন মণীশ ঘটক। তিনি ‘আগুন তাদের প্রাণ’ কবিতায় লিখেছেন এভাবেÑ মহুয়া ফুলের গন্ধ দিকে দিকে আগুন ছড়ায়/মহুয়া ফুলের মদ রক্তে রক্তে আগুন ধরায়/কালো ছেলে-মেয়ে দুটো সাধ করে সে আগুনে পোড়ে/খল খল হেসে যায় লুটোপুটি গলাগলি করে। বিখ্যাত কবি বন্দে আলী মিয়া তার ‘ময়নামতীর চর’ কবিতায় লিখেছেনÑ এ- পাড়ের এই বুনো ঝাউ আর ও পাড়ের বুড়ো বট/মাঝখানে তার আগাছায় ভরা শুকনো গাঙের তট। বিখ্যাত এই কবিতার প্রতিটি লাইনের সঙ্গে প্রতিটি লাইন গাঁথা। লালন ঘরানার গীতিকবি পাবনার আলী আকবর খান।
কবিতায় খুঁজে বেড়িয়েছেন মানুষ। এ কারণেই তিনি লিখেছেন, মনপাপী তুই মানুষ চিনিস নারে/ আছে রে যার মানুষের মন/সেই তো মানুষ চিনতে পারে। আবার তিনিই লিখছেন, কার লাইগা তুই কাঁদিস রে মন/মিছে ভাবনা ভেবে যে তোর জীবন সমাপন/ও তুই নিজের জন্য করলি কী কথন? একই ধারার গীতিকবি মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন লিখে গেছেন, চেতন করে রেখো গুরু, করব ভজন সাধনা/গোঁসাই ললিত চাঁদ বলে আগে জন্মে মা।
পাবনার বেড়া উপজেলায় জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত গীতিকবি ছিলেন জিতেন্দ্রনাথ গোস্বামী। গুরুর পথে তিনি চলেছেন জীবন ভর। তিনি লিখেছেন, গুরুর বাড়ি যাবি মনা, গুরুর বাড়ি যাবি মনা/প্রেম জোয়ারে ভাসা ওরে ষোলো দাঁড়ের পানসি খানা। বিখ্যাত গীতিকবি ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই খ্যাত’ গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার এই জেলার কৃতি-সন্তান। চাটমোহরে জন্মগ্রহণ করা দয়াল কৃষ্ণদাস একজন একনিষ্ঠ গীতিকবি। তিনি লিখেছেন, প্রশ্ন করি সাধুর দরবারে/গন্ধম কি ফল বল না আমারে/ও সে ফল কি হয় ফুল/কোথায় রয় তাহা একবার দেখাও না আমারে। পাবনার গোবিন্দা মহল্লায় জন্ম নেওয়া আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা, তুমি যে আমার কবিতা/আমারও বাঁশির রাগিনী/আমারও স্বপন আধ-জাগরণ/চিরদিন তোমারে চিনিÑ গানটি আজ কে না জানে। প্রতিবাদী গীতিকবিদের মধ্যে অন্যতম আলাউদ্দিন আলো।
কবির এই লাইনগুলোই প্রমাণ। ‘খেটে খাওয়া মানুষের মুখের গ্রাস/কেড়ে নিয়েছে ওই জোতদার/আইনেও পাই না আশ্রয়/তাই সংগ্রামে পেতে চাই অধিকার। পাবনার বেড়া উপজেলার গীতিকবি মোহাম্মদ আব্দুল করিম লিখেছেন, আজ সূর্যমুখী ফুটল আমার প্রেমের আঙিনায়/প্রাণ জুড়িয়ে যায়রে আমার হৃদয় ভরে যায়। তার সমসাময়িক গীতিকবি মধুসূদন মজুমদার। কবির ’পরকালের পথ’ শীর্ষক গীতিকবিতায় লিখেছেন, মায়ার খেলা ছাড়রে মন/বেলা যে তোর যায় চলিয়া/ভর পাড়ের মাঝি এসে/ডাকে দু’হাত তুলিয়া। বেড়া উপজেলার খানপুরায় জন্ম নেওয়া আনোয়ার হোসেন মা শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন, মায়ের মনে আঘাত দিলে/মক্কায় গেলে হজ না হয়। নিভৃতে থাকা হাবিল উদ্দিনও পাবনা জেলার একজন স্বনামধন্য গীতিকবি।
কবির আমরা সৈনিক কবিতায় লিখেছেন, আমরা সৈনিক/- আমরা নির্ভিক/ আমরা নও জোয়ান/ আমরা দেশের মান/ ঐক্য শৃঙ্খলের জালে বাঁধা/আমাদের সবার প্রাণ। এ ছাড়াও পাবনার গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে আরও অনেক গীতি কবি যারা মুখে মুখেই গানের লাইন বাঁধছেন আবার সুরও করছেন। এর মধ্যে অনেক কবি সাহিত্য জগতে পরিচিত হয়েছেন আবার অনেকেই থেকে গেছেন দৃষ্টির আড়ালে।
পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার গীতিকবি আজিজুল হক। তিনি তার বন্ধু ভাবলে চলবে না কবিতায় লিখেছেনÑ তোমার বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে যমুনা/বন্ধু এসো না এসো না অভাগীরে দুঃখ দিও না/সেই যে গেলে লঞ্চে চড়ে আজও ফিরলে না/বন্ধু বুঝলে না বুঝলে না তোমার ছাড়া প্রাণে বাঁচি না। হুমায়ুন কবির গীতি কবিতায় লিখেছেন দেশের কথা। সবুজের বুকে লাল পতাকাটা চিরদিন/বাংলার স্মৃতি নিয়ে উড়ছে/ধন্য তোমার বুক শহিদের খুনে আঁকা/প্রদীপ শিখার মতো জ্বলছে। অবহেলা আর সঠিক সংরক্ষণের অভাবে সেসব মহামূল্যবান সম্পদ আমাদের হাতছাড়া হচ্ছে। আমরা জানতেও পারছি না। যাদের চিনেছি তাদেরও তো সেভাবে সাহিত্যাঙ্গনে মূল্যায়ন হচ্ছে না। সেসব সংগ্রহ করে পুঁথিবদ্ধ করতে সক্ষম হলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃত ভান্ডার হতো আরও সমৃদ্ধ।