মনিরুল ইসলামঃ
ভারতীয় উপমহাদেশের হাজার বছরের ভৌগোলিক ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এক বেদনাবিধুর চেতনাসমৃদ্ধ অনুষঙ্গ। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির কূটচালে অখণ্ড ভারতভূমি দ্বিখণ্ডিত হয়, যা দেশভাগ নামে পরিচিত। বৈদিক যুগের প্রাক-আর্য থেকে ১৯৪৭ সালের পূর্বপর্যন্ত নানা ভিনদেশি শাসক, বিজাতি, বিভাষী ও বিধর্মী ভারতভূমি শাসন ও শোষণ করেছে। ব্রিটিশরা ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পূর্বে জাতি ও ধর্মের নামে যে দুইটি দেশের সৃষ্টি করেছে, তা সংকটে ফেলেছে বঙ্গভূমিকে, বঙ্গভাষাকে এবং বাঙালি জাতিকে। এই দেশভাগ নীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে অখণ্ড বাংলায়। দুই দেশের জনজাতি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে স্বাধীনতা ও মুক্তি পেলেও তারা হারিয়েছে নিজেদের জাতিসত্তাগত পরিচয়। যে বাঙালি জাতি সর্বদা তার আত্মপরিচয় নিয়ে গর্ব অনুভব করেছে, এর ফলে সে সত্তাগত অস্তিত্ব-সংকটে পড়েছে। এসব বিষয় শওকত আলীর ওয়ারিশ (১৯৮৯), উত্তরের খেপ (১৯৯১), স্ববাসে প্রবাসে (২০০১), বসত (২০০৫) ইত্যাদি উপন্যাসে উঠে এসেছে। লেখক পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হন। তিনি ব্যক্তিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি নিয়ে রচনা করেছেন এসব কালজয়ী উপন্যাস। এগুলো শৈল্পিক কাঠামোতে ঋদ্ধ এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যবহ। এসব রচনায় ঔপন্যাসিক বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। এতে আলোচিত হয়েছে লেখকের নিজের জন্মভূমি ত্যাগের যন্ত্রণা এবং মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিন্তা ও সামাজিক মূল্যবোধের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা। এসব উপন্যাসে বাঙালি জাতিসত্তার মর্মমূল অনুসন্ধানে অনুসৃত হয়েছে ঐতিহাসিক গবেষণাপদ্ধতি। বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় অন্বেষণের সূত্র ধরে আলোচ্য প্রবন্ধে দেশভাগের যন্ত্রণাময় অনুভূতি এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট অনুসন্ধান করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।