শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মাদারীপুর জেলা পুলিশের মাস্টার প্যারেড, কল্যাণ সভা ও অপরাধ সভা অনুষ্ঠিত মাদারীপুরে পুকুরে ডুবে ২ জমজ বোনের মৃত্যু মাদারীপুরে মটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষ : নারী-শিশুসহ আহত ৬ নিখোঁজের পরদিন মিলল বস্তাবন্দি মরদেহ: অভিনেত্রী শিমু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যা ঘটেছিল বগুড়ার ১৩ উপজেলায় হবে মিনি স্টেডিয়াম: প্রতিমন্ত্রী ‘গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করেননি আবদুস শহিদ’ মাদারীপুরে সর্বজনীন পেনশন মেলা, বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শিবচরে মাকে হত্যা, ৫ দিন পর আড়িয়াল খাঁ নদে মিলল শিশুর অর্ধগলিত লাশ এবার সালমান শাহ হত্যা মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন ডলি জহুর বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির বৈশ্বিক উৎসব

নিখোঁজের পরদিন মিলল বস্তাবন্দি মরদেহ: অভিনেত্রী শিমু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যা ঘটেছিল

মনিরুল ইসলাম

মনিরুল ইসলামঃ

অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু হত্যা মামলাটি একসময় ঢাকাই শোবিজ অঙ্গনসহ পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি সকালে চিত্রগ্রহণের (শুটিং) উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তিনি। পরদিন ১৭ জানুয়ারি ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছের একটি ঝোপঝাড় থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় তাঁর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এই ঘটনার নেপথ্যে উঠে আসে পারিবারিক কলহ, নৃশংসতা ও আলামত গোপনের নানামুখী নাটকীয়তা।

মঞ্চ থেকে রুপালি পর্দায় অভিষেক

মঞ্চনাটকের মাধ্যমে অভিনয়ে হাতেখড়ি হওয়া শিমু প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াতের নজরে এসে বড় পর্দায় পদার্পণ করেন। ১৯৯৮ সালে ‘বর্তমান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্যারিয়ারে প্রায় ২৫টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। রূপালী পর্দার পাশাপাশি ছোট পর্দাতেও ছিল তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি; অভিনয় করেছিলেন প্রায় ৫০টির মতো নাটকে। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জামাই শ্বশুর’ ছিল তাঁর অভিনীত সর্বশেষ সিনেমা। পরবর্তী সময়ে তিনি অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বিপণন বিভাগের কাজেও যুক্ত হন।

দাম্পত্য জীবনের সুখে ফাটল ও সন্দেহ

অভিনয়সূত্রে পরিচিত হয়ে ২০০৪ সালে ব্যবসায়ী সাখাওয়াত আলী নোবেলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শিমু। গ্রিন রোডের বাসায় দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁদের সংসার ছিল। তবে তদন্তে উঠে আসে, বেশ কিছু দিন ধরেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন চলছিল। স্ত্রীকে কেন্দ্র করে স্বামী নোবেলের মনে নানা সন্দেহ জন্ম নেয়, যা নিয়ে প্রায়ই তাঁদের মধ্যে কড়া বাকবিতণ্ডা ও শারীরিক নির্যাতন পর্যন্ত গড়াত। বৈশ্বিক মহামারির সময়ে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এই পারিবারিক অশান্তিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একপর্যায়ে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর কিছুদিন আগে গৃহবিবাদের বিষয়ে বোনের কাছে আক্ষেপও ব্যক্ত করেছিলেন শিমু।

ঘটনার দিন সকালে যা ঘটেছিল

২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি সকাল সাতটার দিকে শুটিংয়ের কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার দাবি করেন সাখাওয়াত। তবে নির্ধারিত স্থানে শিমু না পৌঁছালে স্বজনেরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। বারবার ফোন করেও তাঁকে পাওয়া না গেলে শিমুর বোন ফাতিমা নিশা কলাবাগান থানায় গিয়ে নিখোঁজের ডায়েরি করেন। স্ত্রীর সন্ধানের নাটক সাজিয়ে থানায় যান স্বামী নোবেলও।

বস্তাবন্দী মরদেহ ও সুতা টানতেই মেলে সূত্র

পরদিন ১৭ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে ঝোপের মধ্যে একটি পরিত্যক্ত বস্তা দেখে পুলিশে খবর দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ বস্তা খুলে এক নারীর লাশ উদ্ধার করে, যা পরে শিমুর ভাই শহিদুল ইসলাম শনাক্ত করেন।

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে শুরুতে শিল্পী সমিতির অভ্যন্তরীণ কোন্দল সূত্রে জায়েদ খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও পরবর্তীতে তদন্তকারীদের নজর পড়ে পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে। শিমু-নোবেল দম্পতির ব্যবহৃত নিজস্ব গাড়িটি পরীক্ষা করতে গিয়েই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে।

গাড়ির ভেতরের তীব্র ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ পুলিশকে সন্দেহপ্রবণ করে তোলে। বোঝা যায়, রক্ত ও আলামত মুছে ফেলার জন্য সেখানে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে। অধিকন্তু, গাড়ির ভেতরে মেলে এক গোছা নাইলনের দড়ি, যা শিমুর মরদেহ পেঁচানো বস্তার দড়ির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।জিজ্ঞাসাবাদে স্বামীর স্বীকারোক্তিগাড়ির আলামতের ওপর ভিত্তি করে নোবেল ও তাঁর বন্ধু এস এম ওয়াই আবদুল্লাহ ফরহাদসহ ছয়জনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। রিমান্ডে তীব্র জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সত্য উগরে দেন নোবেল।পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে উঠে আসে, ১৬ জানুয়ারি সকালেই গৃহকাজে নিয়োজিত কর্মীকে কৌশলে বাইরে পাঠিয়ে শিমুর সঙ্গে লিপ্ত হন চরম ঝগড়ায়। একপর্যায়ে শিমুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন নোবেল। এরপর বন্ধু ফরহাদকে ডেকে নিয়ে লাশ বস্তাবন্দি করা হয়। বিকেলে বের হয়ে দিনের আলো থাকায় পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফিরে আসেন তারা। পরবর্তীতে রাত ৯টার দিকে কেরানীগঞ্জের নির্জন স্থানে বস্তাটি ফেলে আসা হয়।পরবর্তী সময়ে নোবেল নিজ সন্তানের কাছে ফোন করেও স্ত্রীকে হত্যার বিষয়ে ক্ষমা চান বলে পুলিশি সূত্রে জানা যায়। নিখোঁজের যে রূপকথা তৈরি করেছিলেন স্বামী, পুলিশের সূক্ষ্ম তদন্তে তা খসে পড়ে শিমু হত্যাকাণ্ডের আসল ও নিষ্ঠুর সত্যটি উন্মোচিত হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা