মনিরুল ইসলামঃ
অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু হত্যা মামলাটি একসময় ঢাকাই শোবিজ অঙ্গনসহ পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি সকালে চিত্রগ্রহণের (শুটিং) উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তিনি। পরদিন ১৭ জানুয়ারি ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছের একটি ঝোপঝাড় থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় তাঁর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এই ঘটনার নেপথ্যে উঠে আসে পারিবারিক কলহ, নৃশংসতা ও আলামত গোপনের নানামুখী নাটকীয়তা।
মঞ্চ থেকে রুপালি পর্দায় অভিষেক
মঞ্চনাটকের মাধ্যমে অভিনয়ে হাতেখড়ি হওয়া শিমু প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াতের নজরে এসে বড় পর্দায় পদার্পণ করেন। ১৯৯৮ সালে ‘বর্তমান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্যারিয়ারে প্রায় ২৫টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। রূপালী পর্দার পাশাপাশি ছোট পর্দাতেও ছিল তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি; অভিনয় করেছিলেন প্রায় ৫০টির মতো নাটকে। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জামাই শ্বশুর’ ছিল তাঁর অভিনীত সর্বশেষ সিনেমা। পরবর্তী সময়ে তিনি অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বিপণন বিভাগের কাজেও যুক্ত হন।
দাম্পত্য জীবনের সুখে ফাটল ও সন্দেহ
অভিনয়সূত্রে পরিচিত হয়ে ২০০৪ সালে ব্যবসায়ী সাখাওয়াত আলী নোবেলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শিমু। গ্রিন রোডের বাসায় দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁদের সংসার ছিল। তবে তদন্তে উঠে আসে, বেশ কিছু দিন ধরেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন চলছিল। স্ত্রীকে কেন্দ্র করে স্বামী নোবেলের মনে নানা সন্দেহ জন্ম নেয়, যা নিয়ে প্রায়ই তাঁদের মধ্যে কড়া বাকবিতণ্ডা ও শারীরিক নির্যাতন পর্যন্ত গড়াত। বৈশ্বিক মহামারির সময়ে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এই পারিবারিক অশান্তিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একপর্যায়ে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর কিছুদিন আগে গৃহবিবাদের বিষয়ে বোনের কাছে আক্ষেপও ব্যক্ত করেছিলেন শিমু।
ঘটনার দিন সকালে যা ঘটেছিল
২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি সকাল সাতটার দিকে শুটিংয়ের কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার দাবি করেন সাখাওয়াত। তবে নির্ধারিত স্থানে শিমু না পৌঁছালে স্বজনেরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। বারবার ফোন করেও তাঁকে পাওয়া না গেলে শিমুর বোন ফাতিমা নিশা কলাবাগান থানায় গিয়ে নিখোঁজের ডায়েরি করেন। স্ত্রীর সন্ধানের নাটক সাজিয়ে থানায় যান স্বামী নোবেলও।
বস্তাবন্দী মরদেহ ও সুতা টানতেই মেলে সূত্র
পরদিন ১৭ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে ঝোপের মধ্যে একটি পরিত্যক্ত বস্তা দেখে পুলিশে খবর দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ বস্তা খুলে এক নারীর লাশ উদ্ধার করে, যা পরে শিমুর ভাই শহিদুল ইসলাম শনাক্ত করেন।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে শুরুতে শিল্পী সমিতির অভ্যন্তরীণ কোন্দল সূত্রে জায়েদ খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও পরবর্তীতে তদন্তকারীদের নজর পড়ে পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে। শিমু-নোবেল দম্পতির ব্যবহৃত নিজস্ব গাড়িটি পরীক্ষা করতে গিয়েই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে।